§ কোঠারি কমিশন বা ভারতীয় শিক্ষা কমিশন (Indian Education Commission - 1964-66)

Nil's Niva
0

Q. Explain briefly the composition of Indian Education Commission.

§  কোঠারি কমিশন বা ভারতীয় শিক্ষা কমিশন (Indian Education Commission - 1964-66):

১৯৬৪ সালের ১৪ই জুলাই ভারত সরকার প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. দৌলত সিং কোঠারির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা কমিশন গঠন করে, যা ‘কোঠারি কমিশন বা ‘ভারতীয় শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। স্বাধীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করে একটি সুসংহত ও আধুনিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করাই ছিল এই কমিশনের মূল লক্ষ্য। এই কমিশনটি তার গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ভারতের পূর্ববর্তী সমস্ত শিক্ষা কমিশনের চেয়ে অনন্য ও ব্যতিক্রমী ছিল। কমিশনের সদস্য নির্বাচন, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি এবং কার্যপদ্ধতির মধ্যে একটি সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়, যা ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করেছিল। নিচে এই ঐতিহাসিক শিক্ষা কমিশনের বিশদ গঠন ও সংমিশ্রণ আলোচনা করা হলো।

কমিশনের সামগ্রিক পরিকাঠামো ও সদস্য সংখ্যা বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি মূলত ১৭ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে একজন ছিলেন সভাপতি, একজন সদস্য-সচিব এবং একজন সহ-সদস্য-সচিব। বাকি ১৪ জন ছিলেন সাধারণ সদস্য। এই ১৭ জন সদস্যের বাইরেও কমিশনকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক স্তরে সাহায্য করার জন্য একটি বিশাল বিশেষজ্ঞ দল এবং উপদেষ্টা মণ্ডলী যুক্ত ছিল। কমিশনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এর সভাপতি ড. দৌলত সিং কোঠারি। তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক ও দূরদর্শী চিন্তাভাবনা সমগ্র কমিশনের কার্যধারাকে একটি প্রগতিশীল রূপ দান করেছিল। তাঁর সঙ্গে সদস্য-সচিব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন জে. পি. নায়েক (J. P. Naik), যিনি ভারতের তৎকালীন প্রাথমিক ও সমাজ শিক্ষার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন। এছাড়া সহ-সদস্য-সচিব হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন জে. এফ. ম্যাকডুগাল (J. F. McDougall), যাঁর আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কমিশনের খসড়া তৈরিতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল।

কমিশনের গঠনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্য ছিল এর আন্তর্জাতিক চরিত্র। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনে কেবল দেশীয় চিন্তাভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বিশ্বস্তরের আধুনিকতম শিক্ষাপদ্ধতি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানোর উদ্দেশ্যে এই কমিশনে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। মোট ১৭ জন সদস্যের মধ্যে ৫ জন ছিলেন বিদেশী শিক্ষাবিদ, যাঁরা বিশ্বের তৎকালীন উন্নত দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এই পাঁচজন বিদেশী সদস্যের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার চার্লস মরিস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রজার রেভেল, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞান একাডেমির অধ্যাপক আই. শুমোভস্কি, ফ্রান্সের ইউনেস্কোর শিক্ষা দপ্তরের শ্রী রেনে মাহেউ-এর প্রতিনিধি এবং জাপানের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। ইউনেস্কো (UNESCO)-র সক্রিয় সহযোগিতায় এই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে কমিশন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি অগ্রগতি, সোভিয়েত ইউনিয়নের বৃত্তিমূলক শিক্ষা কাঠামো এবং ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল, যা ভারতীয় শিক্ষাকে বিশ্বায়নের যুগে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

আন্তর্জাতিক সদস্যদের পাশাপাশি কমিশনের মূল ভিত গড়ে উঠেছিল ভারতের ১২ জন প্রথিতযশা দেশীয় শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে। ভারতীয় সদস্যদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্য, শিক্ষা মন্ত্রকের পদস্থ কর্মকর্তা এবং সমাজসেবীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নাম হলেন বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. পি. ভি. গজেন্দ্রগড়কর, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ. লক্ষ্মণস্বামী মুদালিয়ার , এবং নয়াদিল্লির যোজনা কমিশনের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ভি. কে. আর. ভি. রাও। মুদালিয়ার সাহেবের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতির কারণে পূর্ববর্তী কমিশনের অভিজ্ঞতাকে কোঠারি কমিশন খুব সহজেই কাজে লাগাতে পেরেছিল। এই ভারতীয় সদস্যরা দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে খুব কাছ থেকে জানতেন। ফলে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের আধুনিক চিন্তাভাবনা যাতে ভারতীয় সংস্কৃতির মাটিতে বাস্তবায়িত করা যায়, সেই ভারসাম্য বজায় রাখার দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে পালন করেছিলেন এই দেশীয় শিক্ষাবিদেরা।

কমিশনের কার্যপদ্ধতি এবং অভ্যন্তরীণ বিভাগগুলির বিন্যাস অত্যন্ত সুসংহত ছিল, যা এর কাঠামোগত দক্ষতাকে প্রমাণ করে। সমগ্র দেশের বিপুল শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরকে সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখার জন্য কমিশন নিজেদের মধ্যে ১২টি টাস্ক ফোর্স বা কার্যনির্বাহী দল (Task Forces) এবং ৭টি ওয়ার্কিং গ্রুপ বা কর্মী দল (Working Groups) গঠন করেছিল। এই উপ-সমিতিগুলি শিক্ষার বিভিন্ন নির্দিষ্ট ক্ষেত্র যেমনস্কুল শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা, শিক্ষক শিক্ষণ, বয়স্ক শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং শিক্ষায় অর্থায়ন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নিবিড়ভাবে কাজ করেছিল। প্রতিটি টাস্কোর্সে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হয়েছিল, যাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেন। এই দলগুলি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের প্রায় ৯০০০ শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক, সরকারি কর্মকর্তা, ছাত্র এবং অভিভাবকদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে এবং তাঁদের মতামত লিপিবদ্ধ করে। সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব সমস্যার চিত্রটি কমিশনের পরিকাঠামোয় তুলে আনাই ছিল এই উপ-সমিতিগুলির প্রধান কাজ।

কমিশনের এই বিশাল সংমিশ্রণ ও পরিকাঠামো গড়ে তোলার পেছনে ভারত সরকারের উদ্দেশ্য ছিল একটি সর্বজনীন ও গতিশীল শিক্ষানীতি তৈরি করা, যা কেবল তাত্ত্বিক হবে না, বরং হবে সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী। দেশী ও বিদেশী সদস্যদের এই অভূতপূর্ব মিশ্রণের ফলে কমিশন ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার প্রাচীন ঐতিহ্যকে রক্ষা করে তার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সংযোগ ঘটাতে পেরেছিল। কমিশন দীর্ঘ ২১ মাস ধরে কঠোর পরিশ্রম করে, দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে সমস্ত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করার পর ১৯৬৬ সালের ২৯শে জুন তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এম. সি. চাগলার কাছে প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার একটি সুবৃহৎ ও ঐতিহাসিক প্রতিবেদন জমা দেয়, যার শিরোনাম ছিল ‘শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন’।

পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় শিক্ষা কমিশন বা কোঠারি কমিশনের গঠন কাঠামো কেবল ভারতের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ শিক্ষা সমীক্ষাই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন। ভারতের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সাথে আন্তর্জাতিক স্তরের আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির এমন সুষম সংমিশ্রণ এর আগে বা পরে ভারতের কোনো শিক্ষা কমিশনে দেখা যায়নি। ড. ডি. এস. কোঠারির দক্ষ নেতৃত্ব, জে. পি. নায়েকের প্রশাসনিক দূরদর্শিতা এবং দেশী-বিদেশী সদস্যদের যৌথ মেধা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই এই কমিশন ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী রূপরেখা তৈরি করতে পেরেছিল। এই শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় গঠনের কারণেই কমিশনের সুপারিশগুলি পরবর্তীকালে ১৯৬৮ সালের ভারতের প্রথম জাতীয় শিক্ষানীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয় এবং আধুনিক ভারতের সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়।

জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার

তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি

অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
bookstore