অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি তিনটি প্রধান উত্তরাধিকারী রাজ্যের (বাংলা, অযোধ্যা এবং হায়দ্রাবাদ) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়ন করো।

Nil's Niva
0

Q. Evaluate the political and economic conditions of the three major successor states-Bengal, Oudh, and Hyderabad-in the mid-18th century.

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি তিনটি প্রধান উত্তরাধিকারী রাজ্যের (বাংলা, অযোধ্যা এবং হায়দ্রাবাদ) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়ন করো।

ভূমিকা:

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শক্তিশালী মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং অবক্ষয় শুরু হলে ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর বেশ কয়েকটি স্বাধীন ও অর্ধ-স্বাধীন আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থান ঘটে। এই রাজ্যগুলোকে ঐতিহাসিকরা 'উত্তরাধিকারী রাজ্য' বলে অভিহিত করেন, কারণ এরা মুঘলদের প্রশাসনিক কাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিল। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই উত্তরাধিকারী রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলা, অযোধ্যা এবং হায়দ্রাবাদ।

১. বাংলা (Bengal):

রাজনৈতিক অবস্থা: অষ্টাদশ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাংলায় এক স্বাধীন নওয়াবি শাসনের সূচনা করেন মুর্শিদকুলি খান। ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ার তাকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। মুর্শিদকুলি খান এবং তার পরবর্তী শাসক সুজাউদ্দিন ও আলিবর্দী খানের আমলে বাংলা একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত হয়। তারা নামমাত্র মুঘল সম্রাটের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলেও, বাস্তবে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে শাসন করতেন। আলিবর্দী খানের আমলে মারাঠা আক্রমণ (বর্গি হাঙ্গামা) বাংলার রাজনীতিতে কিছুটা অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও তিনি সাফল্যের সাথে তা মোকাবিলা করেন।

অর্থনৈতিক অবস্থা: অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা ছিল ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী প্রদেশ। মুর্শিদকুলি খান বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি 'মালজামিনি' বা ইজারা ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করেন এবং জমিদারদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন। এই যুগে বাংলার কৃষি উৎপাদন ছিল অত্যন্ত উন্নত। এর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও বাংলা চরম উন্নতি লাভ করে। ঢাকা, মুর্শিদাবাদ এবং হুগলি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। ইউরোপীয় বণিকরা (ব্রিটিশ, ফরাসি, ওলন্দাজ) বাংলার রেশম, সুতিবস্ত্র এবং সোরার (Saltpetre) প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। এই ব্যাপক রপ্তানি বাণিজ্যের ফলে বাংলায় প্রচুর রৌপ্যমুদ্রা প্রবেশ করে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

২. অযোধ্যা (Oudh/Awadh):

রাজনৈতিক অবস্থা: অযোধ্যা প্রদেশের স্বাধীন নওয়াবি বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাদাত খান (বুরহান-উল-মুলক)। ১৭২২ সালে তাকে অযোধ্যার সুবাদার পদে নিযুক্ত করা হয়। সাদাত খান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে স্থানীয় বিদ্রোহী জমিদারদের দমন করেন এবং অযোধ্যায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন। তার মৃত্যুর পর তার ভাগ্নে সাফদার জং এবং পরে সুজা-উদ্দৌলা অযোধ্যার শাসক হন। অযোধ্যার শাসকরা একদিকে মুঘল দরবারের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন, অন্যদিকে নিজেদের রাজ্যকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। লখনউ ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

অর্থনৈতিক অবস্থা: গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত হওয়ায় অযোধ্যার মাটি ছিল অত্যন্ত উর্বর। সাদাত খান একটি নতুন রাজস্ব বন্দোবস্ত চালু করেন যা কৃষকদের জমিদারদের শোষণ থেকে রক্ষা করে এবং রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধি করে। কৃষি উৎপাদনে উদ্বৃত্ত থাকার কারণে অযোধ্যার অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত মজবুত। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে এলাহাবাদ, বেনারস ও লখনউ-এর মতো শহরগুলো অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। নওয়াবদের পৃষ্ঠপোষকতায় হস্তশিল্প এবং সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটে।

৩. হায়দ্রাবাদ:

রাজনৈতিক অবস্থা: দাক্ষিণাত্যে স্বাধীন হায়দ্রাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ও কূটনীতিবিদ নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহ। ১৭২৪ সালে তিনি মুঘল দরবারের দলাদলি ও ষড়যন্ত্রে বীতশ্রদ্ধ হয়ে দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন এবং স্বাধীনভাবে শাসন শুরু করেন। তিনি মুঘল সাম্রাজ্য থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা না করলেও সমস্ত রাজকীয় ক্ষমতা উপভোগ করতেন। তিনি মারাঠাদের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং স্থানীয় শক্তিশালী জমিদারদের অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করেন। তবে ১৭৪৮ সালে নিজাম-উল-মুলকের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যার সুযোগ নিয়ে ফরাসি ও ব্রিটিশরা হায়দ্রাবাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে।

অর্থনৈতিক অবস্থা: নিজাম-উল-মুলক দাক্ষিণাত্যে মুঘলদের প্রবর্তিত মনসবদারি ও জায়গিরদারি প্রথা বজায় রেখেছিলেন, তবে তা নিজের শর্তে পরিচালনা করতেন। তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজস্ব আধিকারিকদের কঠোর হস্তে দমন করেন এবং কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দেন। হায়দ্রাবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তবে করমণ্ডল উপকূলে বাণিজ্যের কারণে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। তা সত্ত্বেও বাংলা বা অযোধ্যার তুলনায় হায়দ্রাবাদের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের (বিশেষ করে মারাঠাদের সাথে) কারণে কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল।

উপসংহার:

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও বাংলা, অযোধ্যা এবং হায়দ্রাবাদের মতো উত্তরাধিকারী রাজ্যগুলি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এই রাজ্যগুলি প্রমাণ করেছিল যে মুঘলদের পতন মানেই ভারতের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অন্ধকার বা 'Dark Age' নয়। বরং, এই রাজ্যগুলি নিজস্ব আঞ্চলিক শাসন ব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে সুসংহত করেছিল। তবে, এদের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল যে এরা আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও দূরদৃষ্টির অভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, যার ফলে শেষ পর্যন্ত তারা উদীয়মান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির শিকারে পরিণত হয়।

জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার

তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি

অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
bookstore