প্রশ্নঃ উপমা কাকে বলে? উদাহরণসহ
উপমা অলংকারের প্রকারভেদগুলি (পূর্ণোপমা, লুপ্তোপমা, মালোপমা, স্মরণোপমা) সম্পর্কে
বিস্তারিত আলোচনা করো।
§ উপমা অলংকারের সংজ্ঞা:
অর্থালংকারের
জগতে সবচেয়ে প্রাচীন, বিস্তৃত এবং মৌলিক অলংকার হলো উপমা। আচার্য ভামহ থেকে শুরু করে
আধুনিক কালের আলংকারিকরা উপমাকে সমস্ত অর্থালংকারের জননী বলে মনে করেন। ‘উপ’ কথার
অর্থ হলো সমীপ বা কাছে, এবং ‘মা’ কথার অর্থ হলো পরিমাপ করা বা তুলনা করা। অর্থাৎ, পাশাপাশি রেখে তুলনা
করাই হলো উপমা।
সংজ্ঞা: দুটি ভিন্ন জাতীয় বস্তুর মধ্যে যখন কোনো সাধারণ
ধর্ম, রূপ বা গুণের ভিত্তিতে তুলনা করা হয় এবং সেই সাদৃশ্য কাব্যে চমৎকারিত্বের সৃষ্টি
করে, তখন তাকে উপমা অলংকার বলে। উপমার মূল শর্ত হলো বস্তু দুটিকে অবশ্যই ভিন্ন জাতীয়
হতে হবে (যেমন মানুষের মুখের সঙ্গে চাঁদের তুলনা)। একই জাতীয় বস্তুর তুলনা (যেমন গরুর
সঙ্গে ছাগলের তুলনা) কাব্যে উপমা হিসেবে গণ্য হয় না।
§ উপমা অলংকারের মূলত চারটি অঙ্গ বা উপাদান থাকে:
১. উপমেয়: যাকে তুলনা করা হয় (মূল বস্তু বা প্রকৃষ্ট বস্তু)।
২. উপমান: যার সঙ্গে তুলনা করা হয় (অপ্রকৃষ্ট বা বহিরাগত
বস্তু)।
৩. সাধারণ
ধর্ম: যে নির্দিষ্ট গুণ বা বৈশিষ্ট্যের
কারণে বস্তু দুটির মধ্যে তুলনা করা হয়।
৪. তুলনাবাচক
শব্দ: যে শব্দ দিয়ে তুলনাটি যুক্ত
করা হয় (যেমন— মতো, ন্যায়, সম, হেন, পারা, যেন ইত্যাদি)।
§ উপমা অলংকারের প্রকারভেদ:
উপমার এই চারটি
অঙ্গের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে উপমা অলংকারকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা
যায়। গবেষণার স্তরে এদের বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
১. পূর্ণোপমা:
সংজ্ঞা: যে উপমা অলংকারে উপমার চারটি অঙ্গই (উপমেয়, উপমান,
সাধারণ ধর্ম এবং তুলনাবাচক শব্দ) বাক্যের মধ্যে স্পষ্টভাবে উপস্থিত বা উচ্চারিত থাকে,
তাকে পূর্ণোপমা বলে।
উদাহরণ:
"তপন-তাপে তপ্ত
বালুকার মতো, জ্বলিতেছে আমার হৃদয়।"
(ছন্দ: মাত্রাবৃত্ত।
মাত্রা: ৬+৬+৬+২)
বিশ্লেষণ:
উপমেয়: হৃদয় (যাকে তুলনা করা হচ্ছে)।
উপমান: তপ্ত বালুকা (যার সঙ্গে তুলনা
করা হচ্ছে)।
সাধারণ ধর্ম: জ্বলিতেছে বা দহন-জ্বালা
(উভয়েরই অভিন্ন গুণ)।
তুলনাবাচক শব্দ: মতো।
যেহেতু এখানে চারটি অঙ্গই পূর্ণাঙ্গভাবে
উপস্থিত, তাই এটি একটি সার্থক পূর্ণোপমা অলংকার।
২. লুপ্তোপমা:
সংজ্ঞা: উপমার চারটি অঙ্গের মধ্যে যদি এক বা একাধিক অঙ্গ
(উপমেয়, উপমান, সাধারণ ধর্ম বা তুলনাবাচক শব্দের যেকোনো একটি বা দুটি) উহ্য বা লুপ্ত
থাকে, তবে তাকে লুপ্তোপমা বলে। কাব্যের সংক্ষেপণ ও গূঢ়ার্থ প্রকাশের জন্য এটি ব্যবহৃত
হয়।
উদাহরণ:
"মুখখানি তার যেন
চাঁদের মতো।"
বিশ্লেষণ:
উপমেয়: মুখখানি (উপস্থিত)।
উপমান: চাঁদ (উপস্থিত)।
তুলনাবাচক শব্দ: যেন/মতো (উপস্থিত)।
সাধারণ ধর্ম: সুন্দর, স্নিগ্ধ বা
উজ্জ্বলতা— এই গুণবাচক শব্দটি বাক্যে উপস্থিত নেই, তা উহ্য আছে।
যেহেতু সাধারণ ধর্মটি লুপ্ত, তাই
এটি ‘ধর্ম-লুপ্তোপমা’ বা সাধারণভাবে লুপ্তোপমা।
৩. মালোপমা:
সংজ্ঞা: ‘মালা’
+ ‘উপমা’ = মালোপমা। যখন একটিমাত্র উপমেয়কে (মূল বস্তু)
স্পষ্টভাবে বোঝানোর জন্য একাধিক উপমান ব্যবহার করা হয়, যেন উপমানের একটি সুদীর্ঘ মালা
গাঁথা হয়েছে, তখন তাকে মালোপমা বলে। একটি ভাবকে নানা দিক থেকে উদ্ভাসিত করতে কবিরা
এটি ব্যবহার করেন।
উদাহরণ:
"বাজিছে বুকের মাঝে,
যেন কোনো বীণা,
যেন কোনো বাঁশি, যেন
কোনো ঝরনার গান।"
(ছন্দ: স্বরবৃত্ত বা
দলবৃত্ত)
বিশ্লেষণ:
এখানে উপমেয় হলো একটিই— ‘বুকের মাঝের ধ্বনি বা স্পন্দন’। কিন্তু এই একটি স্পন্দনকে বোঝাতে কবি উপমান হিসেবে
ব্যবহার করেছেন তিনটি জিনিস— বীণা, বাঁশি এবং ঝরনার গান। একাধিক উপমানের এই শৃঙ্খল বা মালা তৈরি
হওয়ায় এটি মালোপমা অলংকার।
৪. স্মরণোপমা:
সংজ্ঞা: এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অলংকার। যখন কোনো একটি
বস্তুকে (উপমেয়) দেখলে তার সঙ্গে গভীর সাদৃশ্য থাকা অতীত বা অনুপস্থিত অন্য কোনো বস্তুর
(উপমান) কথা গভীরভাবে স্মরণে বা মনে পড়ে যায়, তখন তাকে স্মরণোপমা বলে। এখানে তুলনাটি
সরাসরি না হয়ে স্মৃতির মাধ্যমে উদ্দীপিত হয়।
উদাহরণ:
"কালি মাখা চাঁদ
মুখ, মনে পড়ে যায় সেই মেঘলা রাতের কথা।"
বিশ্লেষণ:
এখানে শিশুর কালিমাখা মুখ (উপমেয়)
দেখে সরাসরি চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি, বরং সেই দৃশ্যটি কবির মনে মেঘে ঢাকা চাঁদের
বা মেঘলা রাতের (উপমান) স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে। সাদৃশ্যের কারণে স্মৃতির এই জাগরণই স্মরণোপমা।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

