পৃথিবী - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ||SKBU 6th Semester Bengali Major-10 Course Type: MAJ-10 Course Title: বিশ শতকের বাংলা কবিতা

Nil's Niva
0

পৃথিবী

- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

      আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো, পৃথিবী,

                শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদিতলে।

 

      মহাবীর্যবতী, তুমি বীরভোগ্যা,

             বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে,

                মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে;

      মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দুঃসহ দ্বন্দ্বে।

                ডান হাতে পূর্ণ কর সুধা

                       বাম হাতে চূর্ণ কর পাত্র,

      তোমার লীলাক্ষেত্র মুখরিত কর অট্টবিদ্রূপে;

      দুঃসাধ্য কর বীরের জীবনকে মহৎজীবনে যার অধিকার।

                শ্রেয়কে কর দুর্মূল্য,

                       কৃপা কর না কৃপাপাত্রকে।

      তোমার গাছে গাছে প্রচ্ছন্ন রেখেছ প্রতি মুহূর্তের সংগ্রাম,

             ফলে শস্যে তার জয়মাল্য হয় সার্থক।

          জলে স্থলে তোমার ক্ষমাহীন রণরঙ্গভূমি,

      সেখানে মৃত্যুর মুখে ঘোষিত হয় বিজয়ী প্রাণের জয়বার্তা।

      তোমার নির্দয়তার ভিত্তিতে উঠেছে সভ্যতার জয়তোরণ,

          ত্রুটি ঘটলে তার পূর্ণ মূল্য শোধ হয় বিনাশে।

 

 

      তোমার ইতিহাসের আদিপর্বে দানবের প্রতাপ ছিল দুর্জয়,

                          সে পরুষ, সে বর্বর, সে মূঢ়।

                    তার অঙ্গুলি ছিল স্থূল, কলাকৌশলবর্জিত;

      গদা-হাতে মুষল-হাতে লন্ডভন্ড করেছে সে সমুদ্র পর্বত;

                    অগ্নিতে বাষ্পেতে দুঃস্বপ্ন ঘুলিয়ে তুলেছে আকাশে।

                          জড়রাজত্বে সে ছিল একাধিপতি,

                                প্রাণের'পরে ছিল তার অন্ধ ঈর্ষা।

 

      দেবতা এলেন পরযুগে —

                             মন্ত্র পড়লেন দানবদমনের,

                  জড়ের ঔদ্ধত্য হল অভিভূত;

               জীবধাত্রী বসলেন শ্যামল আস্তরণ পেতে।

                      উষা দাঁড়ালেন পূর্বাচলের শিখরচূড়ায়,

      পশ্চিমসাগরতীরে সন্ধ্যা নামলেন মাথায় নিয়ে শান্তিঘট।

                               নম্র হল শিকলে-বাঁধা দানব,

         তবু সেই আদিম বর্বর আঁকড়ে রইল তোমার ইতিহাস।

             ব্যবস্থার মধ্যে সে হঠাৎ আনে বিশৃঙ্খলতা,

         তোমার স্বভাবের কালো গর্ত থেকে

                             হঠাৎ বেরিয়ে আসে এঁকেবেঁকে।

         তোমার নাড়ীতে লেগে আছে তার পাগলামি।

      দেবতার মন্ত্র উঠছে আকাশে বাতাসে অরণ্যে

                                          দিনে রাত্রে

                            উদাত্ত অনুদাত্ত মন্দ্রস্বরে।

      তবু তোমার বক্ষের পাতাল থেকে আধপোষা নাগদানব

           ক্ষণে ক্ষণে উঠছে ফণা তুলে,

      তার তাড়নায় তোমার আপন জীবকে করছ আঘাত,

           ছারখার করছ আপন সৃষ্টিকে।

 

      শুভে অশুভে স্থাপিত তোমার পাদপীঠে,

           তোমার প্রচণ্ড সুন্দর মহিমার উদ্দেশে

      আজ রেখে যাব আমার ক্ষতচিহ্নলাঞ্ছিত জীবনের প্রণতি।

           বিরাট প্রাণের, বিরাট মৃত্যুর গুপ্তসঞ্চার

                                              তোমার যে মাটির তলায়

               তাকে আজ স্পর্শ করি, উপলব্ধি করি সর্ব দেহে মনে।

                        অগণিত যুগযুগান্তরের

                        অসংখ্য মানুষের লুপ্ত দেহ পুঞ্জিত তার ধুলায়।

           আমিও রেখে যাব কয় মুষ্টি ধূলি

                        আমার সমস্ত সুখদুঃখের শেষ পরিণাম —

      রেখে যাব এই নামগ্রাসী, আকারগ্রাসী, সকল-পরিচয়-গ্রাসী

                             নিঃশব্দ মহাধূলিরাশির মধ্যে।

 

      অচল অবরোধে আবদ্ধ পৃথিবী, মেঘলোকে উধাও পৃথিবী,

                 গিরিশৃঙ্গমালার মহৎ মৌনে ধ্যাননিমগ্না পৃথিবী,

      নীলাম্বুরাশির অতন্দ্রতরঙ্গে কলমন্দ্রমুখরা পৃথিবী,

                     অন্নপূর্ণা তুমি সুন্দরী, অন্নরিক্তা তুমি ভীষণা।

 

      এক দিকে আপক্কধান্যভারনম্র তোমার শস্যক্ষেত্র,

             সেখানে প্রসন্ন প্রভাতসূর্য প্রতিদিন মুছে নেয় শিশিরবিন্দু

                               কিরণ-উত্তরীয় বুলিয়ে দিয়ে।

      অস্তগামী সূর্য শ্যামশস্যহিল্লোলে রেখে যায় অকথিত এই বাণী —

                                       ‘আমি আনন্দিত '।

           অন্য দিকে তোমার জলহীন ফলহীন আতঙ্কপান্ডুর মরুক্ষেত্রে

              পরিকীর্ণ পশুকঙ্কালের মধ্যে মরীচিকার প্রেতনৃত্য।

       বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুৎচঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে এল

                        কালো শ্যেনপাখির মতো তোমার ঝড়,

              সমস্ত আকাশটা ডেকে উঠল যেন কেশর-ফোলা সিংহ,

                  তার লেজের ঝাপটে ডালপালা আলুথালু ক’রে

                       হতাশ বনস্পতি ধুলায় পড়ল উবুড় হয়ে।

       হাওয়ার মুখে ছুটল ভাঙা কুঁড়ের চাল

                           শিকল-ছেঁড়া কয়েদি-ডাকাতের মতো।

       আবার ফাল্গুনে দেখেছি তোমার আতপ্ত দক্ষিনে হাওয়া

                          ছড়িয়ে দিয়েছে বিরহমিলনের স্বগতপ্রলাপ

                                        আম্রমুকুলের গন্ধে।

        চাঁদের পেয়ালা ছাপিয়ে দিয়ে উপচিয়ে পড়েছে

                                         স্বর্গীয় মদের ফেনা।

                        বনের মর্মরধ্বনি বাতাসের স্পর্ধায় ধৈর্য হারিয়েছে

                                             অকস্মাৎ কল্লোলোচ্ছ্বাসে।

 

        স্নিগ্ধ তুমি, হিংস্র তুমি, পুরাতনী, তুমি নিত্যনবীনা,

     অনাদি সৃষ্টির যজ্ঞহুতাগ্নি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে

                        সংখ্যাগণনার অতীত প্রত্যুষে,

     তোমার চক্রতীর্থের পথে পথে ছড়িয়ে এসেছ

              শতশত ভাঙা ইতিহাসের অর্থলুপ্ত অবশেষ —

        বিনা বেদনায় বিছিয়ে এসেছ তোমার বর্জিত সৃষ্টি

                   অগণ্য বিস্মৃতির স্তরে স্তরে।

 

        জীবপালিনী, আমাদের পুষেছ

                    তোমার খণ্ডকালের ছোটো ছোটো পিঞ্জরে।

        তারই মধ্যে সব খেলার সীমা,

                              সব কীর্তির অবসান।

 

              আজ আমি কোনো মোহ নিয়ে আসি নি তোমার সম্মুখে,

                        এতদিন যে দিনরাত্রির মালা গেঁথেছি বসে বসে

               তার জন্যে অমরতার দাবি করব না তোমার দ্বারে।

                        তোমার অযুত নিযুত বৎসর সূর্যপ্রদক্ষিণের পথে

        যে বিপুল নিমেষগুলি উন্মীলিত নিমীলিত হতে থাকে

        তারই এক ক্ষুদ্র অংশে কোনো একটি আসনের

                                    সত্যমূল্য যদি দিয়ে থাকি,

        জীবনের কোনো একটি ফলবান খণ্ডকে

                যদি জয় করে থাকি পরম দুঃখে

        তবে দিয়ো তোমার মাটির ফোঁটার একটি তিলক আমার কপালে;

                                 সে চিহ্ন যাবে মিলিয়ে

              যে রাত্রে সকল চিহ্ন পরম অচিনের মধ্যে যায় মিশে।

                                    হে উদাসীন পৃথিবী,

                             আমাকে সম্পূর্ণ ভোলবার আগে

                                     তোমার নির্মম পদপ্রান্তে

                             আজ রেখে যাই আমার প্রণতি।

জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার

তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি

অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
bookstore