প্রশ্নঃ পরশুরামের রচয়িত বিরিঞ্চিবাবা গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

Nil's Niva
0

প্রশ্নঃ পরশুরামের রচয়িত বিরিঞ্চিবাবা গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

পরশুরামের (রাজশেখর বসু) ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক রচনা। সাহিত্যের যে কোনো সার্থক সৃষ্টির ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণ কখনো চরিত্রকেন্দ্রিক, কখনো ঘটনাশ্রয়ী আবার কখনো ভাবব্যঞ্জক হয়ে থাকে। পরশুরামের এই গল্পটির নাম ‘বিরিঞ্চিবাবা’ রাখা হয়েছে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ভিত্তি করে। নিচে বিভিন্ন আঙ্গিকে এই নামকরণের সার্থকতা বিচার করা হলো।

গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ বিরিঞ্চিবাবা নামক এক ধূর্ত ও ভণ্ড সাধুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। গল্পের মূল আকর্ষণ এবং কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হলো এই বিরিঞ্চিবাবা। তিনি নিজেকে কয়েক হাজার বছরের পুরনো এক অমর মহাপুরুষ হিসেবে দাবি করেন। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার গালগল্প, তাঁর তথাকথিত আধ্যাত্মিক দর্শন এবং তাঁর প্রতি ভক্তদের অন্ধ ভক্তি—এই সবকিছুই গল্পের মূল কাঠামো তৈরি করেছে। লেখক বিরিঞ্চিবাবা চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের এক বিশেষ শ্রেণীর ভণ্ডামিকে তুলে ধরেছেন, যারা ধর্ম ও বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। যেহেতু গল্পের প্রতিটি মোড় এই চরিত্রটিকে ঘিরেই নির্ধারিত হয়েছে, তাই তাঁর নামে নামকরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।



নামকরণের সার্থকতা গল্পের ব্যঙ্গাত্মক সুরের মধ্যেও নিহিত। ‘বিরিঞ্চি’ শব্দের অর্থ হলো ব্রহ্মা বা সৃষ্টিকর্তা। গল্পের ভণ্ড সাধু নিজেকে এই নামের যোগ্য মনে করতেন এবং নিজেকে জগতের নিয়ন্তা হিসেবে জাহির করতেন। কিন্তু গল্পের শেষে যখন তাঁর ভণ্ডামির মুখোশ খুলে যায় এবং তিনি চোর বা প্রতারকের মতো পালিয়ে যান, তখন এই ‘বিরিঞ্চিবাবা’ নামটি একটি তীব্র শ্লেষ বা বিদ্রূপে পরিণত হয়। নামের গাম্ভীর্য এবং চরিত্রের সারশূন্যতার এই বৈপরীত্যই নামকরণের সার্থকতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

গল্পের অন্যান্য চরিত্রগুলো—যেমন গুরুপদবাবু, পরমার্থ, নিবারণ বা সত্যব্রত—সবাই কোনো না কোনোভাবে বিরিঞ্চিবাবার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভক্তরা তাঁকে ঘিরে মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকে, আর নিবারণ ও সত্যব্রত তাঁর ভণ্ডামি ধরার জন্য সচেষ্ট হয়। গল্পের সংঘাত, ক্লাইম্যাক্স এবং পরিণতি—সবই বিরিঞ্চিবাবার উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। বিরিঞ্চিবাবার ‘কাগমার্গ’ তত্ত্ব বা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে তাঁর আজগুবি ব্যাখ্যাগুলো গল্পের হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি গল্পের শেষে তাঁর পলায়নই গল্পের উপসংহার টেনে আনে।

পরিশেষে বলা যায়, ‘বিরিঞ্চিবাবা’ নামকরণটি কেবল একটি ব্যক্তির নাম নয়, এটি একটি বিশেষ মানসিকতা ও সামাজিক ব্যাধির প্রতীক। লেখক এই একটি নামের মাধ্যমে ভক্তি ও ভণ্ডামির দ্বন্দ্বকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের বিষয়বস্তু এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রভাব এতটাই প্রবল যে অন্য কোনো নাম এর চেয়ে বেশি সার্থক হতে পারত না। সমগ্র কাহিনী বিরিঞ্চিবাবাকে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধেছে এবং তাঁরই পরাজয়ের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে। তাই সামগ্রিক বিচারে ‘বিরিঞ্চিবাবা’ নামকরণটি যথাযথ, সার্থক ও রসোত্তীর্ণ হয়েছে।

জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার

তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি

অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
bookstore