প্রশ্নঃ 'বিরিঞ্চিবাবা'
গল্পে ভণ্ড সাধুর যে স্বরূপ ফুটে উঠেছে, তা গল্পের ঘটনাপ্রবাহ অনুসারে আলোচনা করো।
রাজশেখর বসুর (পরশুরাম)
‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক রচনা। এই গল্পে
লেখক বিরিঞ্চিবাবা নামক এক ধূর্ত ও ভণ্ড সাধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তার প্রতারণার
কৌশলগুলোকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা
যায়, বিরিঞ্চিবাবা কোনো সাধারণ অশিক্ষিত ভণ্ড নন, বরং তিনি আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের
বুলি ব্যবহার করে শিক্ষিত সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারঙ্গম এক সুচতুর জালিয়াত।
গল্পের শুরুতে বিরিঞ্চিবাবার
যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা অলৌকিকত্বের মোড়কে ঢাকা। তার শিষ্য পরমার্থর বর্ণনায় জানা যায়
যে, বিরিঞ্চিবাবার বয়স কয়েক হাজার বছর। তিনি নিজেকে ‘ত্রিকালজ্ঞ’ হিসেবে দাবি করতেন
এবং বলতেন যে তিনি সত্যযুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সব ঘটনার সাক্ষী। এমনকি তিনি দাবি
করতেন যে মহাকালের সব হিসেব তার নখদর্পণে। বিরিঞ্চিবাবার এই দাবির পেছনে কোনো আধ্যাত্মিক
সত্য ছিল না, বরং তা ছিল সাধারণ মানুষের মনে সম্ভ্রম ও বিস্ময় জাগানোর একটি সুপরিকল্পিত
কৌশল। তিনি অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ ও সময়ের ধারণা নিজের
সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে ভক্তদের বোঝাতেন যে তিনি চাইলেই কাউকে অতীতে বা ভবিষ্যতে নিয়ে
যেতে পারেন।
বিরিঞ্চিবাবার ভণ্ডামির
অন্যতম প্রধান দিক ছিল মানুষের অসহায়ত্ব ও লোভকে পুঁজি করা। গল্পের ধনী চরিত্র গুরুপদবাবু
যখন তার মৃত স্ত্রীর আত্মার সঙ্গে কথা বলার জন্য ব্যাকুল, তখন বিরিঞ্চিবাবা সেই সুযোগ
গ্রহণ করেন। তিনি গুরুপদবাবুকে পারলৌকিক নানা মায়ার জালে জড়িয়ে ফেলেন এবং তার বাড়িতে
স্থায়ী আস্তানা গেড়ে বসেন। অন্যদিকে, মেকিরাম আগরওয়ালার মতো ধনাঢ্য ব্যবসায়ীকে তিনি
প্রলোভন দেখান যে, তাকে অতীতে নিয়ে গিয়ে সস্তায় লোহা বা সোনা কেনাবেন। এভাবে ধর্ম ও
আধ্যাত্মিকতার আড়ালে তিনি আসলে বৈষয়িক লাভের ধান্দা করতেন।
ভণ্ডামির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ
ঘটে বিরিঞ্চিবাবার সাজানো ‘অলৌকিক’ কাণ্ডকারখানার মাধ্যমে। তিনি গুরুপদবাবুর বাগানবাড়িতে
আধো-অন্ধকার ঘরে ‘হোম’ বা যজ্ঞের আয়োজন করতেন। ধোঁয়ার আড়ালে কৌশলে দেবতাদের আবির্ভাবের
নাটক সাজিয়ে তিনি ভক্তদের মনে বদ্ধমূল বিশ্বাস জন্মাতেন। এমনকি তার মাহাত্ম্য প্রচারের
জন্য তিনি ‘কাগমার্গ’ বা খাঁচার কাক মুক্ত করার মতো অদ্ভুত ও হাস্যকর সব তত্ত্ব উদ্ভাবন
করেছিলেন, যা সাধারণ ভক্তরা বিনাবাক্যে মেনে নিত।
তবে বিরিঞ্চিবাবার
এই মেকি আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিকতার মুখোশ খসে পড়ে নিবারণ ও সত্যব্রতের হস্তক্ষেপে। নিবারণ
যখন মেসের ভৃত্য ফেকু পাঁড়ের মাধ্যমে জানতে পারে যে, এই তথাকথিত নিরামিষাশী ও সংযমী
সাধু গোপনে মাছ ও ছাগলের মাংস ভক্ষণ করেন, তখন বিরিঞ্চিবাবার ভণ্ডামির পারিবারিক ও
ব্যক্তিগত দিকের কদর্যতা ফুটে ওঠে। তার তথাকথিত পবিত্রতা ছিল কেবল বাইরের আবরণ, ভেতরে
তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত নিম্নরুচির লোভী মানুষ।
গল্পের অন্তিম পর্যায়ে
বিরিঞ্চিবাবার আসল ভীরু স্বরূপটি উন্মোচিত হয়। নিবারণ যখন ‘মৌলবী’ সেজে এবং দলবল নিয়ে
এসে আক্রমণাত্মক আচরণ করে, তখন বিরিঞ্চিবাবার সব ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
প্রাণের ভয়ে তিনি তার লোটাকম্বল ও মায়াজাল ফেলে পলায়ন করেন। একজন সত্যিকারের মহাপুরুষের
যে ধৈর্য ও তেজ থাকার কথা, বিরিঞ্চিবাবার মধ্যে তার লেশমাত্র ছিল না।
পরিশেষে বলা যায়, পরশুরাম
‘বিরিঞ্চিবাবা’ চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের সেই সব সুবিধাবাদী মানুষদের চিত্রিত
করেছেন যারা ধর্ম ও বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষের সরলতাকে শোষণ করে। গল্পের
ঘটনাপ্রবাহ আমাদের শেখায় যে, অলৌকিকতার মোড়কে থাকা মিথ্যার জগৎ শেষ পর্যন্ত যুক্তিবাদ
ও সাহসের কাছে পরাজিত হয়। বিরিঞ্চিবাবা কেবল একটি চরিত্র নয়, বরং তা সমাজের এক চিরন্তন
ভণ্ডামির প্রতীক।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

