প্রশ্নঃ ভারতের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনগুলির
মধ্যে পাঞ্জাব, আসাম, জম্মু ও কাশ্মীর এবং ঝাড়খণ্ডের কেস স্টাডিগুলির তুলনা করে
তাদের সাফল্য ও ব্যর্থতাগুলি বিশ্লেষণ করো।
ভারতে স্বায়ত্তশাসনের দাবি বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত হয়েছে,
যা তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। পাঞ্জাব, আসাম,
জম্মু-কাশ্মীর ও ঝাড়খণ্ড—এই চারটি রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনগুলির কেস স্টাডিগুলির
তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং তাদের সাফল্য ও ব্যর্থতাগুলি নিয়ে আলোচনা করা হলো।
v ১. পাঞ্জাবঃ
পাঞ্জাবের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনটি ছিল মূলত শিখ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের
ভিত্তিতে গঠিত। ১৯৭৩ সালের আনন্দপুর সাহেব প্রস্তাব ছিল এর কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে কেন্দ্র
সরকারের ক্ষমতা প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, মুদ্রা ও যোগাযোগ—এই চারটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ
রেখে বাকি সমস্ত ক্ষমতা রাজ্যের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সাফল্য: এই আন্দোলন শিখ সম্প্রদায়ের
মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছিল এবং রাজ্যে শিরোমণি অকালি দলকে একটি শক্তিশালী
রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিল। পাঞ্জাবে আঞ্চলিক রাজনৈতিক কর্তৃত্বের
উত্থানে এই আন্দোলন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যর্থতা: এই আন্দোলনের
প্রধান ব্যর্থতা হলো এর একটি অংশ চরমপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়া।
এর ফলস্বরূপ ব্যাপক সহিংসতা, অপারেশন ব্লু স্টার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা
দেয়। স্বায়ত্তশাসনের মূল দাবি রাজনৈতিক সংঘাতের পথে এমনভাবে চালিত হয়েছিল যে, এটি
শেষ পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল সমাধান আনতে পারেনি এবং বহুলাংশে ব্যর্থ হয়।
v ২. আসামঃ
আসামের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনটি বহুলাংশে ছিল বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ রোধ, অসমীয়া
ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক সম্পদের উপর বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার
দাবিতে। আসাম আন্দোলন ছিল এক দীর্ঘ ও অহিংস ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন।
সাফল্য: ১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তি স্বাক্ষরের
মাধ্যমে আন্দোলনটি একটি বড় সাফল্য অর্জন করে। এই চুক্তিটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণ
ও বিতাড়নের একটি কাঠামো প্রদান করে এবং অসমীয়াদের সাংবিধানিক, আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা
নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ব্যর্থতা: চুক্তির মূল
উদ্দেশ্য—অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণ ও বিতাড়ন—এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে কার্যকর
হয়নি, যা আন্দোলনের প্রধান ব্যর্থতা। এছাড়া, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং বিভিন্ন উপজাতীয়
গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ, এই আন্দোলনকে দুর্বল করেছে।
v ৩. জম্মু
ও কাশ্মীরঃ
জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি ছিল ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত অনুচ্ছেদ
৩৭০-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত বিশেষ মর্যাদাকে কেন্দ্র করে। এই বিশেষ মর্যাদা রাজ্যকে নিজস্ব
সংবিধান ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিত। এই আন্দোলনটির মূল ভিত্তি ছিল রাজ্যের স্বতন্ত্র
সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখা।
সাফল্য: স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ২০১৯
সাল পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের একমাত্র রাজ্য ছিল যা একটি ভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি
কাঠামো উপভোগ করত। এই বিশেষ ব্যবস্থা রাজ্যটির জনগণের মধ্যে এক প্রকার স্বশাসনের অনুভূতি
তৈরি করেছিল।
ব্যর্থতা: ২০১৯ সালে
কেন্দ্রীয় সরকারের এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করে দেওয়া হয় এবং
রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ) বিভক্ত করা হয়। এটি
স্বায়ত্তশাসনের দাবির চূড়ান্ত বিলুপ্তি ঘটায়। এই পদক্ষেপ চূড়ান্ত ব্যর্থতা হিসেবে
বিবেচিত হয়, কারণ তাদের বহু দশকের সাংবিধানিক সুরক্ষা একতরফাভাবে বাতিল করা হয়।
v ৪. ঝাড়খণ্ডঃ
ঝাড়খণ্ডের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণরূপে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক
ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। বিহারের দক্ষিণাঞ্চলের আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব
সংস্কৃতি, ভাষা এবং বনজ ও খনিজ সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি পৃথক রাজ্যের দাবি
জানিয়েছিল।
সাফল্য: এই আন্দোলন দীর্ঘ এবং সুসংগঠিত
সংগ্রামের পর ২০০০ সালে পৃথক ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনে সফল হয়। এটি ভারতের ইতিহাসে স্বায়ত্তশাসন
আন্দোলনের অন্যতম সফল উদাহরণ, যেখানে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি নতুন প্রশাসনিক
ইউনিট তৈরি হয়েছে।
ব্যর্থতা: রাজ্য গঠনের
পর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হলেও, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার মৌলিক
পরিবর্তন এখনও ঘটেনি। ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশের অবনতি এবং দুর্নীতির কারণে রাজ্যের সম্পদ
আদিবাসীদের কল্যাণে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। ফলে, রাজনৈতিক সাফল্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক
ন্যায়বিচারে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
v তুলনামূলক
বিশ্লেষণঃ
এই চারটি কেস স্টাডির তুলনা করলে দেখা যায় যে, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সাফল্য
নির্ভর করে প্রধানত তিনটি বিষয়ের উপর: আন্দোলনের প্রকৃতি, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া
এবং আন্দোলনের চরম পরিণতি।
পাঞ্জাব ও আসামে স্বায়ত্তশাসনের দাবি চুক্তি ও আংশিক রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে
কিছুটা সাফল্য অর্জন করলেও, এটি বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সশস্ত্র সংঘাতের জন্ম দেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে
স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। জম্মু ও কাশ্মীর সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেও রাজনৈতিক
সিদ্ধান্তে তা হারিয়েছে। অন্যদিকে, ঝাড়খণ্ডের আন্দোলন তার মূল লক্ষ্য—পৃথক রাজ্য
গঠন—অর্জনে সফল হয়েছে, যা চরম রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের একটি রূপ। তবে, সবক্ষেত্রেই
একটি সাধারণ ব্যর্থতা হলো— রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সাফল্য অর্জিত হলেও, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর
আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা এবং সম্পদের উপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখনও একটি অমীমাংসিত সমস্যা
হিসেবে রয়ে গেছে।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

