প্রশ্ন- মানভূমের ঐতিহাসিক
প্রেক্ষাপট আলোচনা করো এবং এই অঞ্চলের বরাভূম ও পঞ্চেত রাজ্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব বর্ণনা
করো।
মানভূমের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত প্রাচীন এবং বৈচিত্র্যময়। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ
ও ঝাড়খণ্ডের এক বিশাল সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে গঠিত এই ভূখণ্ডটি আদিম অরণ্য, পাহাড় এবং
বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের এক সংমিশ্রণ। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি 'বজ্রভূমি' বা 'অরণ্যভূমি'
নামে পরিচিত ছিল। নিচে মানভূমের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এখানকার বরাভূম ও পঞ্চেত রাজ্যের
রাজনৈতিক গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
১. মানভূমের
ঐতিহাসিক বিবর্তন ও জঙ্গলমহল পর্যায়ঃ মানভূমের ইতিহাসের সূচনা মূলত বিভিন্ন স্বাধীনচেতা আদিবাসী ও জনজাতীয় রাজবংশের
হাত ধরে। মধ্যযুগে এটি ঝাড়খণ্ড বা অরণ্য অঞ্চলের অংশ ছিল। ১৮০৫ সালে ব্রিটিশরা এই
অঞ্চলের বিদ্রোহী চুয়াড়দের দমন করতে এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে 'জঙ্গলমহল'
জেলা গঠন করে। ১৮৩২-৩৩ সালের ভূমিজ বিদ্রোহ বা 'গঙ্গানারায়ণ হাঙ্গামা'র পর জঙ্গলমহল
জেলা ভেঙে ১৮৩৩ সালে 'মানভূম' জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল মূলত একটি 'নন-রেগুলেটেড'
জেলা, যা ব্রিটিশদের বিশেষ প্রশাসনিক নজরদারিতে ছিল। এই অঞ্চলের ইতিহাস কেবল শাসন পরিবর্তনের
নয়, বরং অরণ্যবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস।
২. বরাভূম রাজ্যের
রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রতিরোধঃ বরাভূম ছিল মানভূমের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য।
রাজনৈতিকভাবে এই রাজ্যটি ব্রিটিশদের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
এখানকার রাজারা এবং স্থানীয় 'ঘাটওয়াল' বা 'সর্দার'রা ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা।
১৭৬৭ সাল থেকেই বরাভূম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর আদায়ের প্রচেষ্টাকে বাধা
দিয়ে আসছিল। বরাভূমের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় যখন এটি ভূমিজ বিদ্রোহের প্রধান
কেন্দ্রে পরিণত হয়। বীর গঙ্গানারায়ণ সিংহের নেতৃত্বে এই রাজ্য ব্রিটিশ শাসনের ভিত
নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা প্রমাণ করেছিল যে স্থানীয় সংহতি থাকলে একটি বিশ্বশক্তিকেও চ্যালেঞ্জ
করা সম্ভব।
৩. পঞ্চেত রাজ্যের
ঐতিহাসিক প্রতিপত্তি ও প্রতিরক্ষাঃ পঞ্চেত রাজ্য বা 'পঞ্চকোট' ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে
সমৃদ্ধ রাজ্য। ভৌগোলিকভাবে দামোদর নদের তীরে এবং পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে এর অবস্থান
ছিল অত্যন্ত নিরাপদ। রাজনৈতিকভাবে পঞ্চেত রাজ্যটি বাংলা ও বিহারের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন
হিসেবে কাজ করত। মারাঠা দস্যু বা 'বর্গি' আক্রমণের সময় পঞ্চেতের দুর্গটি প্রতিরক্ষার
এক প্রধান দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। মুঘল এবং ব্রিটিশ আমলেও পঞ্চেতের রাজারা নিজেদের
স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন, যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায়
বিশেষ ভূমিকা পালন করত।
৪. ব্রিটিশ
বিরোধী আন্দোলনে বরাভূম ও পঞ্চেতের ভূমিকাঃ বরাভূম ও পঞ্চেত—উভয় রাজ্যই ব্রিটিশদের আগ্রাসী
ভূমিরাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। পঞ্চেতের রাজা নীলমণি সিংহ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে
সরাসরি ব্রিটিশদের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছিলেন। অন্যদিকে,
বরাভূমের ভূমিজ বিদ্রোহ ব্রিটিশদের বাধ্য করেছিল এই অঞ্চলের প্রশাসনিক মানচিত্র পুনর্গঠন
করতে। এই দুই রাজ্যের রাজনৈতিক সক্রিয়তা কেবল মানভূমে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা সামগ্রিকভাবে
বাংলার ব্রিটিশ বিরোধী চেতনায় রসদ জুগিয়েছিল। তাঁদের অদম্য প্রতিরোধই পরবর্তীকালে
মানভূমে এক শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী জনমত তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
৫. প্রশাসনিক
সংস্কার ও মানভূম জেলার সৃষ্টিঃ বরাভূম ও পঞ্চেত রাজ্যের ক্রমাগত অস্থিরতা এবং বিদ্রোহের কারণেই ব্রিটিশ সরকার
বুঝতে পেরেছিল যে এই অঞ্চলটিকে সাধারণ কোনো জেলার অংশ হিসেবে শাসন করা যাবে না। এরই
ফলশ্রুতিতে ১৮৩৩ সালে মানভূম জেলা গঠিত হয় এবং এর সদর দপ্তর হিসেবে মানবাজার ও পরে
পুরুলিয়াকে নির্বাচন করা হয়। এই প্রশাসনিক পুনর্গঠন ছিল এই দুই রাজ্যের রাজনৈতিক
সংগ্রামের এক প্রত্যক্ষ পরোক্ষ স্বীকৃতি। আজ আমরা যে পুরুলিয়া বা মানভুমের ইতিহাস
নিয়ে আলোচনা করি, তার শিকড় মূলত বরাভূমের সাহস এবং পঞ্চেতের ঐতিহ্যের মধ্যেই নিহিত
রয়েছে।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

