প্রশ্নঃ রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে জনকল্যাণকর তত্ত্বের মূলনীতিগুলি আলোচনা করো?

Nil's Niva
0

প্রশ্নঃ রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে জনকল্যাণকর তত্ত্বের মূলনীতিগুলি আলোচনা করো?

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন দার্শনিক ও রাজনৈতিক মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে জনকল্যাণকর তত্ত্ব বা আধুনিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব মূলত রাষ্ট্রকে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করে, যার প্রধান লক্ষ্য হলো নাগরিকদের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করা।

প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের উৎপত্তির পেছনে ‘ঐশ্বরিক মতবাদ বা ‘বলপ্রয়োগ মতবাদ জনপ্রিয় থাকলেও আধুনিক যুগে জনকল্যাণকর মতবাদই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো আধিপত্য বিস্তারের যন্ত্র নয়, বরং এটি জনস্বার্থে সৃষ্ট একটি প্রয়োজনীয় সংগঠন। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে সামাজিক বৈষম্য দূর করতে এই তত্ত্বের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।

v জনকল্যাণকর তত্ত্বের মূলনীতিসমূহঃ

১. সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রঃ জনকল্যাণকর তত্ত্বের প্রধান ভিত্তি হলো রাষ্ট্রকে একটি 'সাধ্য' হিসেবে নয়, বরং 'মাধ্যম' হিসেবে বিবেচনা করা। এখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবনের মান উন্নয়নের একটি মাধ্যম মাত্র। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের সেই বিখ্যাত উক্তি "রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বজায় রয়েছে জীবনের প্রয়োজনে, আর এটি টিকে আছে উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য"—এই নীতির মূল প্রেরণা।

২. মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা ও গ্যারান্টিঃ এই তত্ত্বের অন্যতম প্রধান নীতি হলো নাগরিকদের পাঁচটি মৌলিক অধিকারঅন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসানিশ্চিত করা। রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক অধিকার (যেমন: ভোটদান) দিয়েই ক্ষান্ত হবে না, বরং প্রতিটি নাগরিক যাতে সম্মানের সাথে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারে, তার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

৩. অর্থনৈতিক সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাঃ জনকল্যাণকর রাষ্ট্র চরম পুঁজিবাদকে সমর্থন করে না। এর একটি প্রধান মূলনীতি হলো সম্পদের সুষম বণ্টন। রাষ্ট্র ধনীদের ওপর 'প্রগতিশীল কর' আরোপ করে এবং সেই অর্থ দিয়ে দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এতে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস পায় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে।

৪. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিঃ এই তত্ত্বের একটি মানবিক দিক হলো অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষের সুরক্ষা। বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, এবং পঙ্গু বা অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। রাষ্ট্র এখানে নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন অভিভাবকের মতো ভূমিকা পালন করে।

 

৫. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্যঃ জনকল্যাণকর তত্ত্ব চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (যেখানে রাষ্ট্র কোনো হস্তক্ষেপ করে না) এবং কঠোর সমাজতন্ত্রের (যেখানে সব রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে) একটি চমৎকার সমন্বয়। এটি যেমন ব্যক্তির সম্পত্তিতে অধিকার স্বীকার করে, তেমনি জনস্বার্থে সেই সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপকেও সমর্থন করে। একে অনেক সময় 'মিশ্র অর্থনীতি'র রাজনৈতিক রূপ বলা হয়।

৬. জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রসারঃ একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বিনামূল্যে বা সুলভ মূল্যে প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করা এই তত্ত্বের আবশ্যিক নীতি। শিক্ষিত ও সুস্থ জাতিই রাষ্ট্রের প্রকৃত সম্পদ বলে এই তত্ত্ব মনে করে।

৭. শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণির সুরক্ষাঃ শ্রমিকরা যাতে মালিকপক্ষের দ্বারা শোষিত না হয়, তার জন্য রাষ্ট্র শ্রম আইন প্রণয়ন করে। কাজের সময় নির্ধারণ, ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। একইভাবে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও কৃষিঋণের ব্যবস্থা করাও এই নীতির অন্তর্ভুক্ত।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত জনকল্যাণকর তত্ত্বটি একটি মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল ধারণা। এটি রাষ্ট্রকে কেবল একটি আইনি কাঠামো থেকে বের করে এনে একটি মমতাময়ী ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেছে। আধুনিক বিশ্বের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই বর্তমানে নিজেকে 'জনকল্যাণকর রাষ্ট্র' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।


 

জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার

তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি

অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
bookstore