প্রশ্ন. ভারতের উত্তরের সমভূমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগুলি বর্ণনা
করো। কৃষি, জনবণ্টন এবং অর্থনীতিতে ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
ভারতের উত্তরের সমভূমি অঞ্চল, যা ইন্দো-গাঙ্গেয়-ব্রহ্মপুত্র
সমভূমি নামেও পরিচিত, ভারতের ভূ-প্রকৃতির একটি অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হিমালয় পর্বতমালা
এবং দক্ষিণ ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমির মধ্যবর্তী এই বিশাল অঞ্চলটি কেবল ভারতের নয়,
বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পলল সমভূমি। নিচে এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য এবং এর কৃষি, জনবণ্টন
ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব নীচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
v উত্তরের সমভূমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যঃ
১. গঠন ও পলি সঞ্চয়: হিমালয় পর্বতমালা গঠনের সময় তার পাদদেশে এক বিশাল ভূ-খাত
তৈরি হয়। গত কয়েক লক্ষ বছর ধরে হিমালয় থেকে আসা নদী (সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র)
এবং তাদের উপনদীগুলোর বয়ে আনা পলি, বালি ও পঙ্ক সঞ্চিত হয়ে এই বিশাল সমভূমি সৃষ্টি
হয়েছে। এটি মূলত বিশ্বের বৃহত্তম পলি গঠিত সমভূমি।
২. ভূ-প্রকৃতি ও মৃত্তিকার বৈচিত্র্য: এই সমভূমি অঞ্চলটি অত্যন্ত সমতল এবং ঢাল খুবই সামান্য।
মাটির গঠন অনুসারে একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন— প্রাচীন পলি দ্বারা গঠিত ভাঙ্গর
এবং নদীর প্লাবন ভূমিতে অবস্থিত নবীন ও উর্বর খাদার। এছাড়া হিমালয়ের পাদদেশের নুড়ি
পাথর সমৃদ্ধ ভাবর এবং জলাভূমি অঞ্চল তরাই এই সমভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৩. কৃষিতে ভূমিকা: এই সমভূমি অঞ্চল ভারতের 'খাদ্য ভাণ্ডার' হিসেবে পরিচিত। অত্যন্ত উর্বর পলিমাটি
এবং জলসেচের সুব্যবস্থার কারণে এখানে প্রচুর পরিমাণে ধান, গম, আখ, পাট ও তৈলবীজ উৎপাদিত
হয়। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় উন্নত কৃষি পদ্ধতির প্রয়োগ ভারতকে খাদ্যে
স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছে।
৪. উন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ: সমতল ভূ-প্রকৃতি হওয়ার কারণে এই অঞ্চলে রেল ও সড়কপথের
নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা খুবই সহজ হয়েছে। ভারতের দীর্ঘতম জাতীয় সড়ক এবং ব্যস্ততম রেলপথগুলো
এই সমভূমির ওপর দিয়েই বিস্তৃত। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়ন
এখানে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৫. ঘন জনবসতি ও নগরায়ন: অনুকূল জলবায়ু, উর্বর জমি এবং উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ
থাকায় এটি বিশ্বের অন্যতম নিবিড় জনবসতিপূর্ণ এলাকা। দিল্লি, কলকাতা, কানপুর, বারাণসী
ও লখনউয়ের মতো ভারতের প্রধান প্রধান মহানগর ও ঐতিহাসিক শহরগুলো এই নদীমাতৃক সমভূমি
অঞ্চলেই অবস্থিত।
৬. অর্থনৈতিক গুরুত্ব: ভারতের জিডিপি-তে এই অঞ্চলের অবদান অপরিসীম। কৃষিজাত
কাঁচামালকে কেন্দ্র করে এখানে অসংখ্য চিনি কল, পাট কল এবং বস্ত্র শিল্প গড়ে উঠেছে।
এছাড়া নদীগুলো কেবল সেচের জলই দেয় না, বরং অভ্যন্তরীণ জলপথ হিসেবেও পণ্য পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে।
v কৃষি, জনবণ্টন এবং অর্থনীতিতে ইন্দো-গাঙ্গেয়
সমভূমির ভূমিকাঃ
ভারতের উত্তরের সমভূমি অঞ্চল বা ইন্দো-গাঙ্গেয়
সমভূমি ভারতের ভূ-প্রকৃতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হিমালয় পর্বতমালা ও উপদ্বীপীয়
মালভূমির মধ্যবর্তী স্থানে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পলি সঞ্চিত হয়ে এই বিশাল
সমতল ভূমিটি গঠিত হয়েছে। ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গড়ে ১৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার প্রস্থের
এই সমভূমিটি কেবল ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পলি গঠিত সমভূমি। ভারতের কৃষি,
জনবণ্টন এবং অর্থনীতির প্রধান মেরুদণ্ড হিসেবে এই অঞ্চলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। নিচে
এই তিনটি ক্ষেত্রে সমভূমিটির অবদান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কৃষিক্ষেত্রে ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির
ভূমিকা অপরিসীম। এই অঞ্চলটি ভারতের 'খাদ্য ভাণ্ডার' নামে পরিচিত। এখানকার নদী বাহিত
নবীন পলিমাটি (খাদার) অত্যন্ত উর্বর এবং চাষের জন্য আদর্শ। হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা,
যমুনা ও অন্যান্য উপনদীগুলোতে সারা বছর জলপ্রবাহ থাকায় এখানে অতি সহজে জলসেচ দেওয়া
সম্ভব হয়। পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে গমের রেকর্ড উৎপাদন হয়,
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে ধান ও পাটের ব্যাপক চাষ লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া উত্তরপ্রদেশের
আখের চাষ ভারতের চিনি শিল্পের ভিত্তি মজবুত করেছে। এখানকার জলবায়ু এবং মাটির গুণাগুণের
কারণে বছরে একাধিকবার ফসল উৎপাদন করা যায়, যা দেশের বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা
নিশ্চিত করে।
জনবণ্টনের বিচারে এই সমভূমি অঞ্চলটি
বিশ্বের অন্যতম নিবিড় জনবসতিপূর্ণ এলাকা। অনুকূল জলবায়ু, উর্বর ভূমি এবং উন্নত জীবনযাত্রার
সুযোগ ভারতের প্রায় ৪০% মানুষকে এই অঞ্চলে বসবাস করতে উৎসাহিত করেছে। সমতল ভূ-প্রকৃতি
হওয়ার কারণে এখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে সহজ
ও সাশ্রয়ী। ভারতের প্রধান প্রধান মহানগর যেমন— দিল্লি, কলকাতা, কানপুর, বারাণসী, লখনউ
এবং পাটনা এই সমভূমি অঞ্চলেই অবস্থিত। প্রাচীনকাল থেকেই গঙ্গা নদীর তীরে অসংখ্য ধর্মীয়
ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যা বর্তমানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান ও বসবাসের
ঠিকানা। উন্নত সড়ক ও রেলপথের সংযোগ মানুষকে সহজে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতের সুযোগ
করে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইন্দো-গাঙ্গেয়
সমভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের জাতীয় আয়ের এক বিশাল অংশ এখান থেকেই আসে। এই অঞ্চলের
কৃষি উৎপাদন ভারতের বৃহত্তম শিল্পগুলোর কাঁচামাল সরবরাহ করে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের
পাটকলগুলো এবং উত্তরপ্রদেশের চিনি কলগুলো সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
কৃষির পাশাপাশি সমতল ভূমির কারণে এখানে ভারী শিল্প ও কলকারখানা গড়ে তোলা সহজ হয়েছে।
এছাড়া গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ অভ্যন্তরীণ জলপথ হিসেবেও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। বড় বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলোর উপস্থিতি এখানকার স্থানীয়
অর্থনীতিকে সবসময় সচল রাখে। উত্তর ভারতের রেল নেটওয়ার্ক, যা ভারতের অর্থনীতির জীবনরেখা
হিসেবে পরিচিত, এই সমভূমির ওপর দিয়েই সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আছে।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

