প্রশ্নঃ বস্তি কী? বস্তি গড়ে ওঠার কারণগুলি সম্পর্কে আলোচনা কর।
v
বস্তিঃ
বস্তি
(Slum) হলো একটি জনবসতিপূর্ণ এলাকা, যা সাধারণত আইনগত নিরাপত্তা, উন্নত পরিকাঠামো এবং
মৌলিক নাগরিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত থাকে। বস্তি বলতে সেই সকল বসতিকে বোঝানো হয় যেখানে
ঘরবাড়িগুলি অত্যন্ত ঘন, জীর্ণ ও দুর্বল কাঠামোয় তৈরি, যেখানে মানুষের জীবনধারণের জন্য
ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর পরিবেশ (যেমন: পানীয় জল, পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ) প্রায় অনুপস্থিত।
বস্তিবাসীর বেশিরভাগই দরিদ্র এবং তাদের বাসস্থান বা জমির কোনো আইনি মালিকানা বা নিরাপত্তা
থাকে না। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, বস্তি হলো সেই পরিবারগুলির সমষ্টি, যারা অপর্যাপ্ত
বসবাসযোগ্য স্থান, অনিরাপদ বা অস্থায়ী বাসস্থান এবং দুর্বল মৌলিক পরিষেবাগুলির মধ্যে
জীবনযাপন করে। ভারতের ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, বস্তি হল এমন আবাসিক এলাকা যেখানে
বাসস্থানগুলি অত্যন্ত জরাজীর্ণ, অতিরিক্ত ভিড়, রাস্তার ত্রুটিপূর্ণ বিন্যাস, আলো,
বায়ুচলাচল বা স্যানিটেশন সুবিধার অভাবের কারণে বসবাসের অযোগ্য।
v
বস্তি গড়ে ওঠার প্রধান কারণসমূহঃ
বস্তি গড়ে
ওঠার প্রক্রিয়াটি সাধারণত দ্রুত নগরায়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দুর্বল নগর পরিকল্পনার
ফল। নিচে বস্তি গড়ে ওঠার প্রধান কারণগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. দ্রুত নগরায়ন
এবং গ্রামীণ-শহুরে অভিবাসনঃ গ্রামাঞ্চল থেকে বা ছোট শহর থেকে কর্মসংস্থানের সন্ধানে
লক্ষ লক্ষ মানুষ দ্রুত বড় শহরগুলিতে চলে আসে। শহরে চাকরির সুযোগ এবং উন্নত জীবনযাত্রার
সামান্য প্রত্যাশা মানুষকে অভিবাসনে উৎসাহিত করে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর
জন্য শহরে পর্যাপ্ত সাশ্রয়ী আবাসন না থাকায়, তারা শহরের পরিত্যক্ত, ঝুঁকিপূর্ণ বা অননুমোদিত
সরকারি জমিতে (যেমন: রেললাইনের ধার, নদী তীর) ঘর তৈরি করে থাকতে বাধ্য হয়, যা বস্তিতে
পরিণত হয়।
২. সাশ্রয়ী
আবাসনের অভাব ও অর্থনৈতিক বৈষম্যঃ শহরগুলিতে জমির মূল্য অত্যন্ত বেশি
এবং বেসরকারি বা সরকারি আবাসনগুলি সাধারণত দরিদ্রদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে। শহরের
অর্থনৈতিক বৈষম্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষরা, যারা শহরের
বিভিন্ন পরিষেবা (যেমন: পরিচ্ছন্নতা কর্মী, রিকশা চালক, দিনমজুর) সরবরাহ করে, তারা
শহরের কেন্দ্রেই থাকার প্রয়োজন অনুভব করে, কিন্তু তাদের থাকার জন্য কোনো আইনি বা সাশ্রয়ী
আবাসন থাকে না। এই আবাসন সংকটই বস্তি সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি।
৩. কর্মসংস্থান
এবং জীবিকার নৈকট্যঃ বস্তিগুলি প্রায়শই শহরের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির কাছাকাছি
গড়ে ওঠে। বস্তিবাসী শ্রমিকদের যাতায়াত খরচ কমানো এবং কাজের সুযোগের কাছাকাছি থাকার
প্রয়োজনীয়তা থাকে। ফলে, তারা শহরের কেন্দ্র বা শিল্প এলাকা সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে
বসতি স্থাপন করে। এটি তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য অপরিহার্য।
৪. দুর্বল
নগর পরিকল্পনা ও সরকারি নিষ্ক্রিয়তাঃ অনেক ক্ষেত্রেই শহর কর্তৃপক্ষের সুদূরপ্রসারী
নগর পরিকল্পনার অভাব থাকে। বস্তিগুলি অবৈধ বসতি হওয়া সত্ত্বেও, সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন
দীর্ঘকাল ধরে এই বসতিগুলির দিকে মনোযোগ দেয় না। যখন কর্তৃপক্ষ দ্রুত অভিবাসনের সঙ্গে
তাল মিলিয়ে মৌলিক পরিকাঠামো ও পরিষেবা (যেমন: জল সরবরাহ ও স্যানিটেশন) সম্প্রসারণ করতে
ব্যর্থ হয়, তখন এই অননুমোদিত বসতিগুলিই ধীরে ধীরে বস্তির রূপ নেয়।
৫. সামাজিক
বঞ্চনা ও নিরাপত্তাঃ বস্তিতে বসবাসকারীরা প্রায়শই সমাজের মূলধারা থেকে বঞ্চিত
বা বিচ্ছিন্ন থাকে। এই বসতিগুলি অনেক সময় একই অঞ্চলের বা একই সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষদের
নিয়ে গঠিত হয়, যা তাদের মধ্যে এক ধরনের গোষ্ঠীগত নিরাপত্তা ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করে।
এই বন্ধন তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলায় সাহায্য করে, ফলে তারা বস্তি
ছেড়ে যেতে চায় না।
৬. আবাসন আইনের
দুর্বল প্রয়োগঃ অনেক দেশে আবাসন সম্পর্কিত আইনগুলি হয় দুর্বল, নয়তো
সেগুলির প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। যখন জমি দখলের ক্ষেত্রে বা অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করার
ক্ষেত্রে সরকার কড়া পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তখন মধ্যস্বত্বভোগী বা ভূমি দস্যুরা দরিদ্রদের
কাছ থেকে অর্থ নিয়ে অবৈধভাবে ঘর তৈরির সুযোগ করে দেয়। এই দুর্বল আইনি প্রয়োগ বস্তিগুলিকে
আরও স্থায়ী ও বিস্তৃত হতে সাহায্য করে।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

