প্রশ্নঃ কৃতত্ববাদ কাকে বলে? কৃতত্ববাদের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

Nil's Niva
0

v কৃতত্ববাদঃ

কর্তৃত্ববাদ (Authoritarianism) হলো একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্র বা একদল শাসকের হাতে চরম ক্ষমতা পুঞ্জীভূত থাকে এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত থাকে। এটি গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ধারণা।

কর্তৃত্ববাদ বলতে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে জনমতের তোয়াক্কা না করে শাসকগোষ্ঠী নিজস্ব ইচ্ছামতো দেশ পরিচালনা করে। এখানে শাসকের ক্ষমতা সীমাহীন না হলেও, তা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিনজ (Juan Linz)-এর মতে, "কর্তৃত্ববাদ হলো এমন এক সীমিত রাজনৈতিক বহুত্ববাদ যেখানে কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের বাধ্যবাধকতা থাকে না কিন্তু ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে।"

v কর্তৃত্ববাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহঃ

কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করা যায়:

১. ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীভূতকরণঃ কর্তৃত্ববাদের প্রধান লক্ষণ হলো রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা একজনের হাতে (একনায়ক) অথবা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর (সামরিক বাহিনী বা একক দল) হাতে কুক্ষিগত থাকা। এখানে আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না; বরং তারা শাসন বিভাগের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতার এই এককেন্দ্রিকতা কোনো প্রকার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স (নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য) মানে না।

২. রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবঃ এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার থাকে না বললেই চলে। বহুদলীয় রাজনীতির কোনো স্থান এখানে নেই। বিরোধী দলগুলোকে হয় নিষিদ্ধ করা হয়, অথবা তাদের কর্মকাণ্ড এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যাতে তারা সরকারের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো অবকাশ এখানে থাকে না।

৩. সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধঃ কর্তৃত্ববাদী শাসকরা সবসময় তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন এবং বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া কঠোর সেন্সরশিপের আওতায় থাকে। সরকারের কোনো সমালোচনা প্রচার করা নিষিদ্ধ থাকে এবং শুধুমাত্র সরকারি গুণগান বা প্রোপাগান্ডা প্রচার করা হয়।

৪. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের অবসানঃ কর্তৃত্ববাদে রাষ্ট্রের স্বার্থকে ব্যক্তির স্বার্থের চেয়ে বড় করে দেখা হয়। নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, গোপনীয়তা এবং মৌলিক অধিকার এখানে গৌণ। রাষ্ট্রের প্রয়োজন বা শাসকের স্বার্থে যেকোনো সময় নাগরিক অধিকার হরণ করা হতে পারে। "রাষ্ট্রই সব, ব্যক্তি কিছুই না"—এই নীতি এখানে কার্যকর থাকে।

৫. বলপ্রয়োগ ও ভীতিকর পরিবেশঃ কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকে থাকে মূলত পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার শক্তির ওপর। জনসমর্থনের চেয়ে ভয় দেখানোই এখানে বড় কৌশল। শাসকগোষ্ঠীর অবাধ্য হলে কারাবরণ, শারীরিক নির্যাতন বা গুম হওয়ার মতো কঠোর শাস্তির ভয় দেখিয়ে জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।

৬. আইনের শাসনের অনুপস্থিতিঃ কর্তৃত্ববাদে 'আইনের শাসন' (Rule of Law)-এর পরিবর্তে 'শাসকের আইন' (Rule by Ruler) কাজ করে। এখানে আইন সবার জন্য সমান নয়। শাসকরা নিজেদের সুবিধামতো আইন তৈরি বা পরিবর্তন করে এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধীদের সাজা দেয়।

পরিশেষে বলা যায়, কর্তৃত্ববাদ হলো মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী একটি ব্যবস্থা। একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজে যেখানে মানুষের বাকস্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকারকে সম্মান জানানো হয়, সেখানে কর্তৃত্ববাদের কোনো স্থান থাকতে পারে না। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের প্রসারের মূল লক্ষ্যই হলো এই ধরনের স্বেচ্ছাচারী শাসন থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া।

জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার

তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি

অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
bookstore